মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ইপিআই টিকার প্রতিরোধযোগ্য ৮টি রোগ

ইপিআই টিকার প্রতিরোধযোগ্য ৮টি রোগ

 

ইপিআই কার্যক্রমের মাধ্যমে টিকা দিয়ে যে আটটি রোগ প্রতিরোধ করা যায় সেগুলো হলোঃ ধনুষ্টংকার, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, পোলিও, হাম, যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস -বি, হেমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা । এই সবকটি রোগই সংক্রামক এবং বাংলাদেশে বিদ্যমান। এক বৎসরের কম বয়সের শিশুদের এগুলো অত্যন্ত মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি করে। এই সবকটি রোগই টিকাদানের মাধ্যমে  প্রতিরোধ করা সম্ভব। এক বৎসরের কম বয়সের শিশুরা এবং সন্তান ধারণক্ষম (১৫-৪৯ বৎসর) মহিলারাই হচ্ছে টিকাদানের প্রধান লক্ষ্য (টার্গেট গ্রুপ বা উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী) ।

 

নবজাতকের (৩ থেকে ২৮ দিন) ধনুষ্টংকারের কারণ, রোগজীবানুর নাম, লক্ষণ, ভয়াবহতা ও প্রতিরোধ 

কারণ  

পশুর মলের মাধ্যমে নির্গত এই রোগের জীবাণু মাটির সাথে থাকে । এই রোগের জীবাণু কাটাস্থান দিয়ে শরীরে ঢোকে। শিশুর জন্মের পর অপরিষ্কার (জীবাণুযুক্ত) ছুরি বা ব্লেড দিয়ে নাড়ী কাটলে বা নাড়ীতে গোবর বা ময়লা কাপড় ব্যবহার করলে নবজাত শিশুর (৩ থেকে ২৮ দিন) ধনুষ্টংকার রোগ হয়ে থাকে।

 

রোগজীবানুর নাম  

ক্লষ্ট্রিডিয়াম টিটানী (Chlostridium tetani) ব্যাকটেরিয়া।

 

লক্ষণ  

 জম্মের ১ম ও ২য় দিন শিশু স্বাভাবিকভাবে কাঁদতে পারে এবং বুকের দুধ টেনে খেতে পারে। জন্মের ৩-২৮ দিনের মধ্যে শিশু অসুস্থ্য হয়ে পড়ে এবং শিশু বুকের দুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়, শিশুর মুখ ও চোয়াল শক্ত হয়ে যায় এবং জোরে কাঁদতে পারে না। শিশুর খিঁচুনী হয় এবং শরীর পেছনের দিকে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে যায়।

 

ভয়াবহতা  

নবজাতকের ধনুষ্টংকার শিশুমৃত্যুর একটি প্রধান কারণ। এই রোগের চিকিৎসা করা অত্যন্ত কষ্টকর। এই রোগে আক্রান্ত নবজাতক প্রায়ই মারা যায়।

 

প্রতিরোধ 

গর্ভবর্তী ও সন্তান ধারণক্ষম সকল মহিলাকে যথাশীঘ্র সম্ভব ৫ ডোজ টিটি টিকা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে দিয়ে নবজাতকের ধনুষ্টংকার রোধ করা যায়। এ ছাড়া নিরাপদ প্রসব ও নাভী কাটার জন্য জীবানুমুক্ত  ব্লেড ব্যবহার করতে হবে।

 

ডিপথেরিয়ার কারণ, রোগজীবানুর নাম, লক্ষণ, ভয়াবহতা ও প্রতিরোধ 

কারণ 

ক্ষুদ্র এক প্রকার জীবাণু ডিপথেরিয়া রোগাক্রান্ত শিশুর হাঁচি কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। ঐ জীবানু যখন সুস্থ শিশুর শরীরে প্রবেশ করে তখন এই রোগ দেখা দিতে পারে।

 

জীবাণুর নাম 

করিনেব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরী Corynebacterium diptherae) ব্যাকটেরিয়া।

 

লক্ষণ

 ১-৩ দিন:

  • শিশু খুব সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে
  •  ঠিকমতো খায় না এবং খেলাধুলা করে না
  •  শিশুর জ্বর, সর্দি ও কাশি দেখা দেয়
  •  গলা ফুলে যায় এবং কন্ঠনালী বা গলদেশের ভিতরে সরের মত সাদা আস্তরণ পড়ে।  

৪-৬ দিন:

  • শিশু খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে
  •  কন্ঠনালীর গ্রন্থিগুলি খুব বেশী ফুলে যায়
  •  কন্ঠনালীতে ধুসর রং এর সুস্পষ্ট আস্তর পড়ে
  •  আস্তরটি  শ্বাসনালীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি করে।  

 

ভয়াবহতা  

এ রোগ হৃৎপিন্ড এবং স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করতে পারে এবং শিশুর মৃত্যু ঘটাতে পারে।

 

প্রতিরোধ  

শিশুর জম্মের এক বৎসরের মধ্যে ২৮ দিন বা একমাস পর পর তিন ডোজ ডিপিটি টিকা দিলে তা শিশুকে ডিপথেরিয়া থেকে রক্ষা করে । প্রথম ডোজ ডিপিটি টিকা দেয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হলো শিশুর ছয় সপ্তাহ বয়সে।

 

হুপিং কাশির কারণ, রোগজীবানুর নাম, লক্ষণ, ভয়াবহতা ও প্রতিরোধ 

কারণ  

হুপিংকাশিতে আক্রান্ত শিশু হাঁচি কাশি দেওয়ার সময় বাতাসের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায় এবং আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শেও এই রোগ ছড়ায়।

 

জীবাণুর নাম  

বড়ডেটলা পারটুসিস (Bordetela Pertusis) নামক ব্যাকটেরিয়া।

 

লক্ষণ 

১ম সপ্তাহ - শিশুর জ্বর হয়, নাক দিয়ে পানি পড়ে, চোখ মুখ লাল হয়ে যায়, কাশি দেখা দেয়।

 

২য় সপ্তাহ - কাশি মারাত্মক আকার ধারণ করে । শিশু যখন কাশে তখন তার খুব কষ্ট হয় এবং চোখ স্ফীত ও লাল হয়ে যায় । কাশির পর শিশু হুপ শব্দ করে শ্বাস নেয়। অনেক সময় বমিও হয়। ছয় মাসের কম বয়স্ক শিশু হুপ শব্দ ছাড়াও কাশতে পারে এবং বমি করতে পারে । যদি কাশি তিন সপ্তাহের বেশী সময় ধরে চলে তাহলে হুপিং কাশি বলে অনুমান করা যেতে পারে। 

৩ থেকে ৬ সপ্তাহ - কাশি ধীরে ধীরে কমে যায়।

 

ভয়াবহতা  

হুপিং কাশির ফলে শিশু দূর্বল হয়ে যায় এবং অপুষ্টিতে ভোগে । শিশুর নিউমোনিয়া হতে পারে শিশুর চোখে রক্ত জমাট বেঁধে অন্ধ হয়ে যেতে পারে । শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে।

 

প্রতিরোধ  

শিশুর এক বছর বয়সের মধ্যে ২৮ দিন বা এক মাস অন্তর অন্তর তিন ডোজ ডিপিটি টিকা দিয়ে শিশুকে হুপিং কাশি থেকে রক্ষা করা যায়। প্রথম ডোজ দেয়ার সমচেয়ে ভালে সময় হলো শিশুর ছয় সপ্তাহ বয়সে। ৬ মাস বয়সের মধ্যেই শিশু মারাত্মকভাবে হুপিং কাশিতে আক্রান্ত হয়ে  থাকে সে কারণে ৬ সপ্তাহ বয়স থেকেই ডিপিটি দেয়া শুরু করা অত্যন্ত জরুরী।

 

পোলিও (পোলিও মাইলাইটিস) এর কারণ, রোগজীবানুর নাম, লক্ষণ, ভয়াবহতা ও প্রতিরোধ 

কারণ  

আক্রান্ত শিশুর মল দ্বারা দূষিত পানি খেলে বা আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এলে এই রোগ হতে পারে।

 

জীবানুর নাম

পোলিও ভাইরাস (Polio virus)

 

লক্ষণ  

১-৩ দিন:

  • শিশুর সর্দি, কাশি এবং সামান্য জ্বর হয়।

 

১-৫ দিন:

  • মাথা ব্যাথা করে, ঘাড় শক্ত হয়ে যায়
  • জ্বর থাকে
  •  শিশুর হাত অথবা পা অবশ হয়ে যায়
  •  শিশু দাঁড়াতে চায় না
  • উঁচু করে ধরলে আক্রান্ত পায়ের পাতা ঝুলে পড়ে
  •  দাঁড়া করাতে চাইলে শিশু কান্নাকাটি করে এবং নাড়াচড়া করতে পারে না
  •  শিশুর আক্রান্ত অঙ্গ ক্রমশ দুর্বল হয় এবং পরে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যেতে পারে।

 

ভয়াবহতা  

শিশুর এক বা একাধিক অঙ্গ অবশ হয়ে  য়ায়। ফলে আক্রান্ত অঙ্গ দিয়ে স্বাভাবিক কাজ করতে পারে না । আক্রান্ত অঙ্গের মাংসপেশী চিকন হয়ে যায় । শ্বাস প্রশ্বাসের পেশী অবশ হয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে শিশু মারাও যেতে পারে।

 

প্রতিরোধ  

এক মাস পর তিন ডোজ এবং হামের টিকা দেওয়ার সময় আরো একবার অর্থাৎ মোট চার বার পোলিও টিকা শিশুর এক বছর বয়সের ভিতরে খাওয়ানো হলে তা শিশুর দেহে পোলিও রোগ প্রতিরোধ করে। প্রথম ডোজ দেয়ার সবচেয়ে ভালো সময় শিশুর ৬ সপ্তাহ বয়স। যদি কোন শিশু ক্লিনিক বা হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করে তাহলে তাকে জম্মের পর পরই এক ডোজ পোলিও টিকা দিতে হবে। এটাকে অতিরিক্ত ডোজ বলে গণ্য করতে হবে। এবং শিশুর ৬ সপ্তাহ বয়সে থেকে নিয়মিত চার ডোজের সিডিউল শুরু করতে হবে।

 

হাম এর কারণ, রোগজীবানুর নাম, লক্ষণ, ভয়াবহতা ও প্রতিরোধ 

কারণ  

হামে আক্রান্ত শিশুর কাছ থেকে এই রোগের জীবানু বাতাসের মাধ্যমে সুস্থ  শিশুর শরীরে প্রবেশ করে এবং হাম রোগ সৃষ্টি করে।

 

জীবানুর নাম 

হাম ভাইরাস (Measles virus)                                                                         

 

লক্ষণ  

১-৩ দিন:

  • বেশী জ্বর, সর্দি, কাশি
  • চোখ লাল হয়ে যায় এবং পানিতে টল টল করে

চতুর্থ দিন

  • জ্বর কমে আসে
  • মুখে এবং শরীরে লালচে দানা দেখা দেয়

 

 হামে দানা উঠার ৩/৪ দিন পর দানা কালচে হয়ে একসময় খুসকির মতো হয়ে ঝরে যায়।

 

ভয়াবহতা  

হামের ফলে শিশু নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও পুষ্টিহীনতায় ভোগে। কান পাকা রোগ হতে পারে। শিশুর রাতকানা রোগ দেখা দিতে পারে, এমনকি চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। হামের নানা জটিলতার কারণে অনেক শিশু মারও যায়।

 

প্রতিরোধ 

শিশুর ৯ মাস বয়স পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে তাকে এক ডোজ হামের টিকা দিলে সে হাম রোগের হাত থেকে রক্ষা পাবে । তবে এই টিকা অবশ্যই এক বৎসর পূর্ণ হওয়ার আগেই দেওয়া উচিত। পুষ্টিহীন শিশুরা হামের পরে মারাত্নক রোগ পরবর্তী জটিলতার সম্মুখীন হয়। পুষ্টিহীন শিশুদের পুষ্টিকর পরিপূরক খাবার দিলে তা তাদেরকে হাম পরবর্তী অন্যান্য রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে। হামে আক্রান্ত শিশুকে অবশ্যই এক ডোজ ভিটামিন- এ খাওয়াতে হবে।

 

শিশুদের যক্ষ্মার কারণ, রোগজীবানুর নাম, লক্ষণ, ভয়াবহতা ও প্রতিরোধ 

কারণ  

যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত লোকের সাথে ঘনিষ্ট সংস্পর্শে, আক্রান্ত লোক যখন কাশে তখন তার থুথুর মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় ।

 

জীবানুর নাম 

মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস ( Mycobacterum Tuberculosis) ।

 

লক্ষণ  

  • অল্প অল্প জ্বর ও কাশি, ক্ষুধা কমে যায়, দুর্বলতা, গ্রন্থি ফুলে যায়, পরে পেকে যে গ্রন্থি বগল বা ঘাড়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। অনেক দিন ধরে ধীরে ধীরে ওজন কমে যায় ।  হাড় যে কোন হাড়ের জোড়া ফুলে যায় এবং অচল হয়ে যায়। মেরুদন্ডে যক্ষ্মার ফলে বাঁকা  হযে যায়, ব্যাথা হয়।  মস্তিষ্ক (টিভি মেনিনজাইটিস) - এর ফলে মারাত্মক মাথা ব্যথা, অচেতনতা, ঘাড় শক্ত ও খিঁচুনি হয়।

 

ভয়াবহতা  

সময়মত সঠিক চিকিৎসা না করলে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু হতে পারে এবং রোগ ছড়াতে পারে।

 

প্রতিরোধ  

জম্মের পরপরই যত শীঘ্র সম্ভব বিসিজি টিকা দিলে তা শিশুর দেহে যক্ষ্মার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে জন্মের পর পর বিসিজি দেয়া না হলে, শিশুর এক বৎসর বয়সের মধ্যেই এই টিকা গ্রহণ করা উচিত।

 

হেপাটাইটিস-বি 

কারণ 

  • হেপাটাইটিস-বি লিভারের একটি মারাত্মক রোগ,যা হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়। এমনকি অনেক বছর পরও লিভারে মারাত্মক প্রদাহের সৃষ্টি হতে পারে।
  • উপযুক্ত পরিবেশে মানব দেহের বাইরেও এই ভাইরাস কমপক্ষে ৭দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকে এবং সংক্রমণের ক্ষমতা রাখে।
  • হেপাটাইটিস-বি আক্রান্ত রোগীর রক্ত এবং  দেহ রসের মাধ্যমে ছড়ায়।

 

সংক্রমণ 

এই ভাইরাস একজন হতে আরেকজনের শরীরে নিম্নলিখিত উপায়ে সংক্রমিত হয়ঃ

  • জন্মের সময় নবজাতক তার মায়ের কাছ থেকে সংক্রমিত হতে পারে। মা যদি পূর্বে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত থাকে সেক্ষেত্রে শিশুটি যখন তার মায়ের রক্ত বা জরায়ু হতে নিঃসরিত রসের সংস্পর্শে আসে তখনই সংক্রমিত হয়। বুকের দুধের মাধ্যমে এই ভাইরাস সংক্রমিত হয় না।
  • খেলাধূলার সময় আঘাতের কারণে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত শিশু হতে রক্ত বা অন্যান্য দেহ রসের মাধ্যমে সুস্থ্য শিশুতে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে।
  • ইনজেকশন দেবার সময় জীবাণুমুক্ত সরঞ্জামাদি ব্যবহার না করলে বা দূষিত রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে একজন হতে আরেকজন সংক্রমিত হতে পারে।
  • অনিরাপদ যৌন মিলনের মাধ্যমেও এই ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে।

 

লক্ষণ 

নবজাতক এবং শিশুরাই জীবনের শুরুতেই প্রধানতঃ এ রোগে আক্রান্ত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুদের মধ্যে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্তের লক্ষণ প্রতিফলিত হয় না। কিন্তু পরবর্তীতে এসব শিশুরাই হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদী বাহক হিসেবে থাকে।

 

প্রথমবারের মত যখন একজন কিশোর/কিশোরী বা প্রাপ্ত বয়স্ক লোক হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয় তখন তার মধ্যে সাধারণতঃনিম্নলিখিত লক্ষণ সমূহ দেখা যায়:

  • চামড়া ও চোখ হলুদ হয়ে যায়। একে জন্ডিস বলে
  • প্রস্রাবের রং হলুদ হয়
  • পেটে ব্যথা এবং সেই সাথে জ্বর হয়
  • ক্ষুধামন্দা এবং বমি বমি ভাব বা বমি হয়ে থাকে
  • মাংসপেশী এবং হাড়ের সংযোগস্থলে (গিটে) ব্যথা হয়
  • আক্রান্ত ব্যক্তি সবসময় অস্বস্তি অনুভব করে

 

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে,হেপাটাইটিসের যে কোন ধরনের ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলেই জন্ডিস দেখা যায়। আর হেপাটইটিস-বি ভ্যাকসিন শুধুমাত্র ‘বি’ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে। সুতরাং নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন দেয়ার পর আর জন্ডিস হবে না। কারণ ‘বি’ ভাইরাস ছাড়াও বাকী ৪ প্রকার (হেপাটাইটিস ‘এ’,‘সি’,‘ডি’ এবং ‘ই’) ভাইরাসে আক্রান্ত হলে জন্ডিস হতে পারে।

 

ভয়াবহতা 

হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত শিশুরাই ভবিষ্যতে হেপাটাইটিস -বি ভাইরাসের দীর্ঘ মেয়াদী বাহক হওয়ার ক্ষেত্রে বেশী ঝুঁকিপূর্ণ এবং অন্যদের মাঝে ভাইরাস সংক্রমিত করে। যার ফলে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের কারণে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।

 

প্রতিরোধ

৩ ডোজ হেপাটাইটিস-বি টিকা দিলে  এটি শিশুকে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস থেকে রক্ষা করবে। শিশুর বয়স ৬ সপ্তাহ হলেই  হেপাটাইটিস-বি টিকার ১ম ডোজ দিতে হবে এবং ২৮ দিন বা ১ মাস পরে ২য় ও ৩য় ডোজ হেপাটাইটিস-বি টিকা দিতে হবে। (হেপাটাইটিস-বি টিকা ডিপিটি টিকার সাথে দেয়া হয়)।

 

হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি (হিব) 

কারণ 

হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি এক ধরনের ব্যাকটিরিয়া যা শিশুদের দেহে মারাত্মক সংক্রমণ ঘটায়।

 

ভয়াবহতা 

  • এ সংক্রমণের মধ্যে অন্যতম হলো ব্যাকটেরিয়াল ম্যানিনজাইটিস (ব্যাকটেরিয়া জনিত মস্তিষ্কের সংক্রমণ) এবং মারাত্মক নিউমোনিয়া। এছাড়া এ ব্যাকটেরিয়া রক্ত, অস্থি সন্ধি, হাড়, গলা, কান এবং হৃৎপিন্ডের আবরণের সংক্রমণ ঘটায়।
  • হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘‘এ,বি,সি,ডি,ই,এফ’’ এই ৬ ধরনের হয়ে থাকে। তবে শিশুদের মারাত্মক সংক্রমণের জন্য ৯০% বেশী ক্ষেত্রে হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি দায়ী।
  • সময়মত সঠিক চিকিৎসা না করলে আক্রান্ত শিশু প্রতিবন্ধী হয়ে যেতে পারে,এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসার পরেও শিশু মৃত্যুবরণ করতে পারে।

 

কারা বেশী ঝুঁকিপূর্ণ 

  • হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি রোগটি সাধারণত ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের হয়ে থাকলেও ৪ থেকে ১৮ মাসের শিশুরাই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশী ঝূঁকিপূর্ণ। 
  • শিশুর জন্মের পর পর মায়ের দুধের মাধ্যমে এ রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ জন্মালেও ২-৩ মাসের মধ্যে তা কমে যায়,তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে এ রোগের বিরুদ্ধে টিকা দিতে হবে। 
  • সাধারণত ৫ বছরের বড় শিশুরা বা বয়স্করা এ রোগে আক্রান্ত হয় না। 

 

কিভাবে এ রোগ ছড়ায় 

  • এ রোগের জীবাণু রোগাক্রান্ত শিশুর হাঁচি কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
  • সুস্থ শিশু আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এলে এমনকি আক্রান্ত শিশুর ব্যবহৃত সামগ্রীর (তোয়ালে, খেলনা ইত্যাদি) মাধ্যমে এ জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে এবং রোগের সৃষ্টি করে।

 

প্রতিরোধ 

তিন ডোজ হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি ভ্যকসিন দিয়ে শিশুকে এ রোগ থেকে রক্ষা করা যায়।

 

টিকা 

  • ইপিআই কার্যক্রমে হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি ভ্যাকসিন অর্ন্তভূক্তির ফলে ডিপিটি এবং হেপাটাইটিস-বি টিকা আলাদা আলাদা না দিয়ে সমন্বিতভাবে ১টি টিকার মাধ্যমে ৫টি রোগের (ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি) বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এই টিকাকে পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন বলা হয়।
  • পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা শুধুমাত্র যেসকল শিশুর বয়স ৬ সপ্তাহ বা ৪২ দিন পূর্ণ হয়েছে তাদেরকে ১ম ডোজ দিয়ে শুরু করতে হবে এবং পরবর্তীতে ৪ সপ্তাহ পর পর ২য় ও ৩য় ডোজ টিকা দিয়ে মোট ৩ ডোজ সম্পূর্ণ করতে হবে।
  • সাধারণত ৪-৫ বছর বয়সের মধ্যে শিশুরা স্বাভাবিকভাবে এ রোগের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে,তাই বড়দেরকে সাধারনত এই রোগের জন্য টিকা দেয়ার প্রয়োজন হয় না।
  • যদি শিশুর বয়স ৬ সপ্তাহ বা ৪২ দিন পূর্ণ হয় তবে এলাকার নিকটস্থ যে কোনো টিকাদান কেন্দ্র থেকে শিশুকে এই টিকা দিতে হবে।

 

টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া 

  • এ টিকার সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসাবে সামান্য জ্বর হতে পারে
  • টিকা দেয়ার স্থানে সামান্য লাল হওয়া,ফুলে যাওয়া ও অল্প ব্যথা করতে পারে।

এসব আপনা আপনি ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে সেরে যাবে।

 

এ টিকা কখন দেয়া যাবে না 

এ টিকার সাধারণত কোনো মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। তবে কখনো কখনো পারটুসিস (হুপিংকাশি) উপাদানের কারণে খিঁচুনী হতে পারে। যদি খিঁচুনী হয় তবে তাকে পুনরায় পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন না দিয়ে, ৪ সপ্তাহ পর ১ ডোজ টিটি টিকা দিতে হবে।

 

সচরাচর জিজ্ঞাসা 

প্রশ্ন.১. ইপিআই কার্যক্রমের মাধ্যমে টিকা দিয়ে কোন ছয়টি রোগকে প্রতিরোধ করা যায়?

উত্তর. ইপিআই কার্যক্রমের মাধ্যমে টিকা দিয়ে যে ছয়টি রোগ প্রতিরোধ করা যায় সেগুলো হলোঃ ধনুষ্টংকার, যক্ষ্মা, ডিফথেরিয়া, হাম, হুপিংকাশি এবং পোলিও ।

 

প্রশ্ন.২.টিকা কাদের কে দেয়া হয়?

উত্তর. এক বৎসরের কম বয়সের শিশুরা এবং সন্তান ধারণক্ষম (১৫-৪৯ বৎসর) মহিলারাই হচ্ছে টিকাদানের প্রধান লক্ষ্য  (টার্গেট গ্রুপ বা উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠী) ।

 

প্রশ্ন.৩.ধনুষ্টংকারের লক্ষণগুলো কি কি?

উত্তর. জম্মের ১ম ও ২য় দিন শিশু স্বাভাবিকভাবে কাঁদতে পারে এবং বুকের দুধ টেনে খেতে পারে। জন্মের ৩-২৮ দিনের মধ্যে শিশু অসুস্থ্য হয়ে পড়ে এবং শিশু বুকের দুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়, শিশুর মুখ ও চোয়াল শক্ত হয়ে যায় এবং জোরে কাঁদতে পারে না। শিশুর খিঁচুনী হয় এবং শরীর পেছনের দিকে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে যায়।

 

প্রশ্ন.৪. ধনুষ্টংকার কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়?

উত্তর. গর্ভবর্তী ও সন্তান ধারণক্ষম সকল মহিলাকে যথাশীঘ্র সম্ভব ৫ ডোজ টিটি টিকা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে দিয়ে নবজাতকের ধনুষ্টংকার রোধ করা যায়। এ ছাড়া নিরাপদ প্রসব ও নাভী কাটার জন্য জীবানুমুক্ত  ব্লেড ব্যবহার করতে হবে।

 

প্রশ্ন.৫.পোলিও কেন হয়?

উত্তর. আক্রান্ত শিশুর মল দ্বারা দূষিত পানি খেলে বা আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এলে এই রোগ হতে পারে।

 

প্রশ্ন.৬.ডিপথেরিয়া কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়?

উত্তর. শিশুর জম্মের এক বৎসরের মধ্যে ২৮ দিন বা একমাস পর পর তিন ডোজ ডিপিটি টিকা দিলে তা শিশুকে ডিফথেরিয়া থেকে রক্ষা করে । প্রথম ডোজ ডিপিটি টিকা দেয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হলো শিশুর ছয় সপ্তাহ বয়সে।

 

তথ্যসূত্র

  1. ফিল্ড সার্ভিস প্রদানকারীদের ইএসপি রিফ্রেশার প্রশিক্ষণ কারিকুলাম, প্রশিক্ষণার্থী গাইডবুক ২০০৬-২০০৭, পৃষ্ঠা:১০৯-১৩৮,স্বাস্থ্য অধিদপ্তর,স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
  2. প্রতিরোধযোগ্য ৭টি রোগ, পৃষ্ঠা:২১, ইপিআই সহায়িকা, ষষ্ঠ সংস্করণ, ২০০৭, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচী (ইপিআই), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর,, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। 
  3. হিমোফাইলাস ইনফ্লুলেয়ঞ্জা-বি ভ্যাকসিন, হিব জনিত নিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিস প্রতিরোধ, তথ্য কণিকা, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচী (ইপিআই), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।